অবিভক্ত বাংলার তিনজন মূখ্যমন্ত্রী
- এ. কে. ফজলুল হক (১৯৩৭-১৯৪৩)
- খাজা নাজিমউদ্দিন (১৯৪৩-১৯৪৬)
- হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী (১৯৪৬-১৯৪৭)
আবুল কাশেম ফজলুল হক (শের-ই-বাংলা / হক সাহেব):
আবুল কাশেম ফজলুল হক (২৬ অক্টোবর ১৮৭৩ – ২৭ এপ্রিল ১৯৬২) একজন প্রখ্যাত বাঙালি আইনজীবী, লেখক ও রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তিনি বঙ্গের জনগণের মধ্যে শের-ই-বাংলা বা হক সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন। ফজলুল হক কলকাতার মেয়র (১৯৩৫), অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (১৯৩৭–১৯৪৩), পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী (১৯৫৪), পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (১৯৫৫) ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর (১৯৫৬–১৯৫৮) পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি কৃষক প্রজা পার্টির মাধ্যমে নিম্নবর্গীয় হিন্দু ও মুসলিম কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছেন এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মুসলিম লিগের সঙ্গে কখনো সমঝোতা, কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুক্ত ছিলেন।
একে ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রিসভা (The First Ministry of Fazlul Huq)
কোনো দল একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ ও কৃষক-প্রজা পার্টির কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন এ. কে ফজলুল হক। বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য ১৯৩৮ সালে হক মন্ত্রিসভা একটি কমিশন গঠন করে যা 'ফ্লাউড কমিশন' নামে পরিচিত। ১৯৩৮ সালে হক মন্ত্রিসভা বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন করে জমিদারদের অধিকার হ্রাস এবং কৃষকদের অধিকার বৃদ্ধির চেষ্টা করেন। ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় চাষী খাতক আইন প্রবর্তন করেন। এই আইনের ফলে বাংলার সর্বত্র 'ঋণ সালিসি বোর্ড' গঠিত হয়। ফজলুল হক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা আইন প্রণয়ন করেন। ঢাকার কৃষি কলেজ এবং বরিশালের চাখার কলেজ স্থাপনের কৃতিত্ব হক সাহেবের। মুসলিম নারীদের শিক্ষার জন্য ঢাকায় ইডেন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
একে ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা (The Second Ministry of Fazlul Huq)
১৯৪১ সালে মুহম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে মতানৈক্যর ফলে এ কে ফজলুল হক মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি ড. শ্যামপ্রসাদের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন। এ মন্ত্রিসভা শ্যামা-হক মন্ত্রিভা নামে পরিচিত। এই মন্ত্রিসভার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এ কে ফজলুল হক। ১৯৪৩ সালে এই মন্ত্রিসভার পতন হয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
খাজা নাজিমুদ্দিন (KCIE):
খাজা নাজিমুদ্দিন (১৯ জুলাই ১৮৯৪ – ২২ অক্টোবর ১৯৬৪) একজন প্রখ্যাত বাঙালি রাজনীতিবিদ এবং ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য ছিলেন। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের মাধ্যমে তিনি দুইবার বাংলার প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর মৃত্যুর পর ১৯৪৮ সালে তিনি পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হন এবং ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের মৃত্যুর পর পাকিস্তানের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি রক্ষণশীল নীতির ছিলেন, তবে তার সরকার দুই বছরের মধ্যে পদচ্যুত হয়। ১৯৫৩ সালের লাহোর দাঙ্গা, পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন এবং অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে তার সরকার ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৯৬৪ সালে ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
খাজা নাজিমউদ্দীনের মন্ত্রিসভা
১৯৪৩ সালে শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার পতন ঘটলে খাজা নাজিমউদ্দীনের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা গঠন করে।
হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী:
হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী (৮ সেপ্টেম্বর ১৮৯২ – ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৩) ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাঙালি রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। তিনি অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুক্তফ্রন্ট গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ায় ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তবে ভারতে তাকে একটি বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হয়, কারণ কলকাতা দাঙ্গার জন্য তাকে আংশিকভাবে দায়ী করা হয়।

১৯৪৬ সালের নির্বাচন ও সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভা
The Election of 1946 & the Suhrawardy Ministry
১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আবুল হাসেম এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ জয়লাভ করে। ১৯৪৬ সালের ২৪ এপ্রিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। এটি ছিল অবিভক্ত বাংলার শেষ মন্ত্রিসভা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অবিভক্ত বাংলার শেষ মুখ্যমন্ত্রী।